মোঃ খাইরুল ইসলামনিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, সিএনজি ও গণপরিবহন চালক এবং জরুরি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। গত ১০ দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক চুলা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য তৈরি হয়েছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহনে। গ্যাসের অভাবে অনেক অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকছে, ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকে কালিয়াকৈর পৌরসভা, সফিপুর, চন্দ্রা ও মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কালিয়াকৈর উপজেলা বেসরকারি ক্লিনিক এলাকার সড়ক থেকে শুরু করে সিএনজি স্টেশন পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স ও সিএনজির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। কালিয়াকৈর থেকে ঢাকায় রোগী নিয়ে যাওয়ার পথে একটি সিএনজি স্টেশনে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র ৩০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স চালক সেলিম। তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা গুরুতর এবং অক্সিজেন চলছে। এত অল্প গ্যাসে কয়েক কিলোমিটারও যাওয়া সম্ভব নয়। পথে রোগীর কোনো ক্ষতি হলে এর দায় কে নেবে এমন প্রশ্নও করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো রোগীদের হাসপাতালে নিতে না পারায় কয়েকজন রোগীর রাস্তায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব মৃত্যুর সঙ্গে গ্যাস সংকটের সরাসরি সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আবাসিক এলাকাতেও একই চিত্র। কালিয়াকৈর বাজারের বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, সকাল ৬টা থেকে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেও আগুন পাননি। সকাল ১০টার দিকে কিছু সময় গ্যাস এলেও পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্তানদের স্কুলের টিফিন তৈরি করতে না পেরে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। তার অভিযোগ, গ্যাস সংকটের সুযোগে এলপিজির দামও বেড়ে গেছে। আগে যে সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটি এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গ্যাসের অভাবে কালিয়াকৈর উপজেলার ২৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১৫টি বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। চালু থাকা কয়েকটি স্টেশনেও সরবরাহ অত্যন্ত কম। একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরা দুপুর ২টার দিকে মাত্র ৩০ থেকে ৭০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। চালক রফিক মিয়া বলেন, “সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুপুর ২টায় ৭০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এই গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পরিবারের খরচ ও মালিকের জমা—কোনোটাই দেওয়া সম্ভব নয়।”
গ্যাসের সংকটে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদেরও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ বাতিল এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) কালিয়াকৈর জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক জানান, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে আবাসিক ও যানবাহন খাতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তবে পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
তীব্র গ্যাস সংকটে ক্ষুব্ধ কালিয়াকৈরবাসীর দাবি, দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে আবাসিক, যানবাহন ও শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট দূর করতে হবে। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি যানবাহনে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে রোগীদের জীবন রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন