কালিয়াকৈর (গাজীপুর)
একসময় কালিয়াকৈরের গ্রামবাংলার সকাল-বিকেলের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসত ডাকপিয়নের সাইকেলের টুংটাং ঘণ্টির শব্দ। কাঁধে চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে পথে পথে ছুটে বেড়াতেন ডাকপিয়ন। আর গ্রামের মানুষ জানালার ফাঁক দিয়ে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকতেন হয়তো আজ প্রিয়জনের চিঠি এসেছে।
কেউ অপেক্ষা করতেন প্রবাসী সন্তানের চিঠির জন্য, কেউ স্বজনের খবরের আশায়। একটি ছোট্ট খাম ঘিরেই তৈরি হতো আনন্দ, আবেগ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন কেবলই স্মৃতি। মুঠোফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারে মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। ফলে হাতে লেখা চিঠির ব্যবহার কমতে কমতে এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের আগের ব্যস্ততাও।
সরেজমিনে কালিয়াকৈর পৌরসভার কেন্দ্রীয় পোস্ট অফিস ও চাপাইর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর সাব-পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতো নেই মানুষের ভিড়। পোস্ট অফিসের সামনে থাকা লাল রঙের চিঠির বাক্সটিও অনেকটা জরাজীর্ণ। কোথাও কোথাও ধরেছে মরিচা। কর্মচারীরাও আগের মতো ব্যস্ত নন। পোস্ট অফিসের দেয়ালে টাঙানো ‘ডাক ঘর—POST OFFICE’ লেখা সাইনবোর্ডেও পড়েছে সময়ের ছাপ।
পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার জানান, ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০টি ব্যক্তিগত চিঠি আসত। প্রবাসীদের চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, বিভিন্ন নথিপত্র ও মানি অর্ডারের জন্য মানুষ সকাল থেকেই পোস্ট অফিসে ভিড় করতেন। ডাকপিয়ন সাইকেল নিয়ে বের হলেই অনেকেই তার পথ আটকে জানতে চাইতেন, তাদের নামে কোনো চিঠি এসেছে কি না।
তিনি বলেন, “এখন মাসে ৫-৬টি ব্যক্তিগত চিঠিও আসে না। যোগাযোগের প্রায় সবকিছুই অনলাইনে চলে গেছে।
কালিয়াকৈর এলাকার এক ডাককর্মী বলেন, “আগে সকালে ব্যাগভর্তি চিঠি নিয়ে বের হতাম। এখন সেই ব্যাগে চিঠির চেয়ে পার্সেল, ব্যাংকের কাগজপত্র ও সরকারি নোটিশই বেশি থাকে। সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ শুনে এখন আর মানুষ ছুটে আসে না। কারণ প্রয়োজনীয় খবর মুহূর্তেই মোবাইলে পৌঁছে যায়।
কালিয়াকৈরের ৭২ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল মজিদের কাছে চিঠির স্মৃতি এখনো জীবন্ত। তার ছেলে সৌদি আরবে থাকতেন। মাসে একটি চিঠির আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতেন তিনি। আব্দুল মজিদ বলেন, “ছেলের চিঠির জন্য ১৫ দিন আগে থেকেই অপেক্ষা করতাম। ডাকপিয়ন চিঠি দিলে সবাই মিলে বসে সেই চিঠি পড়তাম। কখনো চোখে পানি আসত, আবার কখনো হাসি ফুটত মুখে। এখন ভিডিও কলে কথা হয়, কিন্তু কাগজের ওপর প্রিয় মানুষের হাতের লেখার যে স্পর্শ, সেটা আর পাওয়া যায় না।”
গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, একসময় মেয়ের বিয়ের কার্ডও চিঠির মাধ্যমে আসত। সেই কার্ড এখনো আলমারিতে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আজকের প্রজন্মের অনেকেই চিঠি কী, সেটাই জানে না। স্থানীয় শিক্ষক মো. জামাল বলেন, “আজকের প্রজন্ম হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বড় হচ্ছে। তাদের কাছে চিঠি লেখা যেন ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু আমরা যারা চিঠির যুগ দেখেছি, তারা জানি—একটি খামের মধ্যে কত আবেগ, ভালোবাসা আর অপেক্ষা লুকিয়ে থাকত।
পোস্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ডাক বিভাগের আয়ের বড় একটি অংশ আসে পার্সেল, ব্যাংকিং সেবা ও সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে। ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে মানুষের যোগাযোগ সহজ ও দ্রুত হয়েছে। কয়েক সেকেন্ডেই এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায় খবর। কিন্তু সেই দ্রুততার ভিড়ে হারিয়ে গেছে অপেক্ষার মায়া, হাতে লেখা অক্ষরের আবেগ আর ডাকপিয়নের সাইকেলের সেই চেনা টুংটাং শব্দ।
চিঠির ব্যবহার কমেছে, হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের ব্যস্ত দিনও। তবু কালিয়াকৈরের প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও বেঁচে আছে ছোট্ট একটি খামের গল্প—যে খামের ভেতরে থাকত প্রিয় মানুষের হাতের লেখা, দীর্ঘ অপেক্ষার আবেগ আর নিখাদ ভালোবাসা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন