আস্থাহীনতায় টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এনজিও হাসপাতাল, ‘সব রোগের ওষুধ প্যারাসিটামল’ দেওয়ার অভিযোগ
কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত এনজিও হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়াসহ বেশিরভাগ রোগীকে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথিত ভুল বা মনগড়া মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। কখনো কখনো ওআরএস বা স্যালাইন দেওয়া হলেও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয় না বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে পরিচালিত এনজিও হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না করা, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
বিশেষ করে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মুচনী এলাকায় ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত টিডিএইচ হাসপাতাল নিয়ে রোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ তুলনামূলক বেশি। তাদের দাবি, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অনেক রোগী প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ পাচ্ছেন না। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে স্থানীয় ফার্মেসি বা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি বদরুল ইসলাম ওরফে বজলু বলেন, টিডিএইচ হাসপাতালে রোগীদের প্যারাসিটামল ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না এমন অভিযোগ আমরা নিয়মিতই শুনছি।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) সিনিয়র সহসভাপতি সাংবাদিক নেতা শামসুল আলম শারেক অভিযোগ করে বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগীদের বসিয়ে রেখে বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। এদিকে টিডিএইচ হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এমন মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
সচেতন অভিভাবক ও হ্নীলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আমিন চৌধুরী বলেন, “টিডিএইচ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানোর পর বিনামূল্যের ওষুধ হিসেবে কয়েক দিনের প্যারাসিটামলসহ অল্প কিছু ওষুধ দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও তদন্ত করা প্রয়োজন। জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম ও রিপোর্ট প্রদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখা।”
অভিযোগের বিষয়ে টিডিএইচ হাসপাতালে কর্মরত মেডিকেল ডক্টর সুপারভাইজার ডা. ইশমাম কামালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে বিস্তারিত জানতে সরাসরি টিডিএইচ হাসপাতালের অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেন।২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) আব্দুল হান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেন, কোনো মেডিকেল রিপোর্টের কারণে রোগী বা স্বজনদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। এতে রোগীর মানসিক চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে তিনি দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আগামী জেলা সমন্বয় সভায় টিডিএইচ হাসপাতালের বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলে জানান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এনজিও পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার আশায় অনেক রোগী যান। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় তাদের একটি অংশ এখন স্থানীয় হাসপাতাল ও ফার্মেসিমুখী হচ্ছেন। এতে সরকারি ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শুধু ২৬ নম্বর ক্যাম্পের টিডিএইচ হাসপাতাল নয়, টেকনাফের লেদা ২৪ নম্বর ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী আইওএম হাসপাতাল এবং আলীখালী ২৫ নম্বর ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী আইআরসি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
এদিকে, দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগের কারণে সংশ্লিষ্ট এনজিও হাসপাতালগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা, ওষুধের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এনজিও পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন