বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে সুনাম অর্জন করেছে, তা দেশের ভাবমূর্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি সেনাদের পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও দক্ষতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি এক উদ্বেগজনক বাস্তবতাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন রাষ্ট্রের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, এমনকি জাতিসংঘভিত্তিক ফোরামগুলোতেও, বাংলাদেশ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ উত্থাপন করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে এগুলো কি কেবল মতপ্রকাশ, নাকি সুপরিকল্পিত কৌশল?
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো চলতি বছরের ২৯ ও ৩০ আগস্ট নেদারল্যান্ডসের হেগে অনুষ্ঠিত আনরিপ্রেজেন্টেড নেশনস অ্যান্ড পিপলস অর্গানাইজেশন (UNPO)-এর ২১তম সাধারণ অধিবেশন। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS)-এর প্রতিনিধি প্রীতি বিন্দু চাকমা একটি রাষ্ট্রদ্রোহী প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়, মাঠপর্যায়ে সামরিকীকরণ পরিত্যাগ, তথাকথিত ডি-ফ্যাক্টো সামরিক প্রশাসন প্রত্যাহার (অপারেশন আপগ্রেড এর আওতায়) এবং এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
এখানেই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে রাষ্ট্র কাঠামোর অংশ হয়ে এবং রাষ্ট্রের সুবিধা ভোগ করে কেউ কি আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য বহির্বিশ্বকে আহ্বান জানাতে পারে?
প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয় যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক সামরিকীকৃত অঞ্চল, যেখানে ৪০০-এর বেশি অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্প রয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাস্তুচ্যুতি ও দমন-পীড়নের নানা অভিযোগও উত্থাপন করা হয়।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো- এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নিজস্ব অবস্থানের ভিত্তিতে উপস্থাপিত; প্রদত্ত দাবির নির্ভরযোগ্যতা ও যাচাইযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাইরে আঞ্চলিক ও প্রবাসী প্রেক্ষাপটেও উসকানিমূলক বয়ান সামনে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৭ আগস্ট ভারতের মিজোরাম রাজ্যের কমলগঞ্জে ‘চাকমা ব্ল্যাক ডে’ পালন করা হয় এবং ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকার সম্পর্কিত কিছু বিতর্কিত দাবি উত্থাপন করা হয়। এ ধরনের কর্মসূচি ও বয়ানকে অনেকেই 'পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু' আন্তর্জাতিকীকরণের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।
সবকিছু মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে যে, একটি সুপরিকল্পিত বয়ান, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি নির্দিষ্ট অপশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশ ও সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে রাষ্ট্র নীরব কেন?
রাষ্ট্র কি অবগত নয় যে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেও জেএসএস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে? রাষ্ট্র কি মনে করে এ ধরনের কার্যক্রম দেশের ভাবমূর্তিতে কোনো প্রভাব ফেলে না?
নাকি কোনো কৌশলগত কারণে এই নীরবতা বজায় রাখা হচ্ছে? নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস+বাস্তব উদাহরণ নিত্যদিনের ঘটনা।
বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী যেমন ইউপিডিএফ, জেএসএস, কেএনএফ, মগ লিবারেশন পার্টি সহ অন্যান্য ছোট-বড় দলে-উপদলে ভাগ হয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলো নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে প্রকাশ্যে নিয়মিত চাঁদাবাজি, গোলাগুলি, হানাহানি সহ নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে । যেখানে স্থানীয় অধিবাসীরা নিয়মিতই বিরক্ত কিন্তু মুখ বন্ধ রাখাই যে একমাত্র রুটিন। পাহাড়ি সন্ত্রাসী'রা বরাবরই পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার হরণ করে যাচ্ছে।
কিন্তু এই বাস্তবতা কি রাষ্ট্রীয় নজর কেড়েছে?
যদি রাষ্ট্র অবগত থেকেই থাকে তাহলে নীরবতায় আবদ্ধ থাকা কতটা যৌক্তিক? বরং এই সংবেদনশীলতাই রাষ্ট্রকে আরও সংগঠিত, তথ্যভিত্তিক ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার কথা।
এখানে রাষ্ট্রদ্রোহের প্রশ্নটিও অনিবার্যভাবে সামনে আসে। যখন কোনো পক্ষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন বক্তব্য উপস্থাপন করে, যা একপাক্ষিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, তখন তা নিছক মতপ্রকাশের সীমা অতিক্রম করে। রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীরবতা এ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, যেখানে জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সুতরাং, সমাধান কেবল কঠোরতায় নয়, বরং কৌশলগত দৃঢ়তায়ও থাকতে পারে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে সরকারকে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে।
তৃতীয়ত, পার্বত্য অঞ্চলের প্রকৃত চিত্র, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক অগ্রগতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে, যাতে একপাক্ষিক বয়ান মোকাবিলা করা যায়।
অবশেষে, প্রয়োজন অনুসারে বিষয়গুলোকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ ও রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান একসঙ্গে চলতে না পারে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। যারা রাষ্ট্র ও জনগণের সুযোগ-সুবিধায় আঞ্চলিক পরিষদ সহ সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছে, তাদের ন্যূনতম জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, রাষ্ট্র নীরব কেন? আর এই নীরবতা কতদিন?
জবাবদিহিতা, কৌশলগত দৃঢ়তা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই সময়ের দাবী।
আরো উল্লেখ্য যে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সরকারের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে এবং একটি শান্তি চুক্তিতে সাক্ষর করে। চুক্তির পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত জেএসএস রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে এমনকি জেএসএস প্রধান সন্তু লারমা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারি সকল সুবিধা ভোগ করছেন। তবে এর পরও পার্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখা এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে অস্ত্র মজুদ করাসহ বহির্বিশ্বে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার প্রমাণ ভিত্তিক অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন