আলমগীর মানিক,রাঙামাটি,
কাপ্তাই হ্রদের পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় হ্রদ সৃষ্টির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং হ্রদ তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ ও বসবাসের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাপ্তাই হ্রদ পরিচালনা সংক্রান্ত কারিগরি সাবকমিটি। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত কারিগরি সাবকমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান পানির পরিস্থিতি, পানি সংরক্ষণ, স্পিলওয়ে পরিচালনা এবং পানি নিষ্কাশনের কারণে বাঘাইছড়ি ও লংগদুসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় জানানো হয়, চলতি মৌসুমে রাঙামাটি অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদের পানি ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে হ্রদ তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ এবং কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির সময় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বর্তমান বসবাস ও জীবিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হবে। কারিগরি সাবকমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপৎসীমায় না পৌঁছানো পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য খোলা স্পিলওয়ের জলকপাট পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্পিলওয়ে পরিচালনা এবং হ্রদের পানি নিষ্কাশনের ফলে বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত হালদা নদীতে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ঝুঁকি মোকাবিলায় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি টারবাইন চালু রাখার বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাঠানো চিঠি নিয়েও আলোচনা হয়।
সভায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি কর্মসূচি এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কাপ্তাই হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনা ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসককে ঘিরে বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও আলোচনা করা হয়। কারিগরি সাবকমিটির সভাপতি, সদস্যসচিবসহ সদস্যরা এসব সংবাদকে অতিরঞ্জিত ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানান। সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপককে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাঠানো চিঠি এবং সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা চলাকালে লংগদু উপজেলা থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তারা চলতি বছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পানিবন্দিত্ব কমাতে কাপ্তাই হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনায় নেওয়া উদ্যোগের জন্য জেলা প্রশাসন ও কারিগরি সাবকমিটিকে ধন্যবাদ জানান। স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানান, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ ও হ্রদ সৃষ্টির পর দীর্ঘ সময়ে হ্রদে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পলি জমেছে। ফলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় ১০৫ ফুট এমএসএল উচ্চতায় পানি থাকলেও লংগদুসহ হ্রদের উজান ও তীরবর্তী কিছু এলাকায় পানির উচ্চতা তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়। এতে কাপ্তাই হ্রদে পানি সংরক্ষণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিম্নাঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য তৈরি হয়।
তাদের দাবি, বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর দীর্ঘ সময় পানিবন্দি হয়ে পড়েন। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা ব্যাহত হয়। অনেক পরিবার বছরের একটি বড় সময় চাষাবাদ থেকেও বঞ্চিত হয়। সভায় স্থানীয় প্রতিনিধিরা কাপ্তাই হ্রদ পরিচালনা সংক্রান্ত কারিগরি সাবকমিটিতে হ্রদনির্ভর জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি হ্রদ তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ করেন।
এ সময় বর্তমান কারিগরি সাবকমিটি পুনর্গঠন করে রাঙামাটি ও কাপ্তাই হ্রদনির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানানো হয়। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী। এতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান, রাঙামাটি বিএফডিসির ম্যানেজার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন