মোঃ হুমায়ুন কবির,বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সামাজিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশের সংবিধানে ব্যবহৃত পরিভাষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচলিত ‘Indigenous Peoples’ ধারণা কি একই অর্থ বহন করে?
বিষয়টি বুঝতে হলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় এই তিনটি বিষয়কে পাশাপাশি বিবেচনা করা জরুরি। সংবিধানে কী বলা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে দেশের বিভিন্ন, tribes, minor races, ethnic sects and communities-এর স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সংবিধান এসব জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে লক্ষণীয় হলো, এই অনুচ্ছেদে সরাসরি ‘Indigenous Peoples’ বা ‘আদিবাসী জনগণ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি।
এখানে ‘tribes’, ‘minor races’, ‘ethnic sects’ ও ‘communities’—এ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটির সাংবিধানিক, নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘Indigenous Peoples’ বলতে কী বোঝায়?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে বিবেচিত হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতে Indigenous Peoples-এর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ও সর্বজনীন কঠোর সংজ্ঞার পরিবর্তে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো আত্মপরিচয় বা self-identification। অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের কীভাবে পরিচয় দেয়, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কও বিবেচনায় আসে।
ILO Convention No. 169 কী বলে? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)-এ Indigenous ও Tribal Peoples সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে।
এর Article 1 অনুযায়ী, কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ বৈশিষ্ট্য এবং আত্মপরিচয়—দুই ধরনের মানদণ্ডই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মপরিচয়কে একটি মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখানে ঐতিহাসিকভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক, স্বতন্ত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব জীবনধারার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আগে বসবাস করলেই কি ‘আদিবাসী’ হওয়া যায়, এই প্রশ্নটিই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনো জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ কোনো ভূখণ্ডে কত আগে থেকে বসবাস করে আসছেন—তা অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক কাঠামো কেবল ‘কে আগে এসেছে, এই একটি প্রশ্নের ওপর নির্ভর করে না। আত্মপরিচয়, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব রীতিনীতি এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়।
অর্থাৎ, ‘কে আগে এসেছে’ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিতর্কের মূল জায়গা কোথায়, বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে মোটামুটি দুটি প্রধান অবস্থান দেখা যায়।
এক পক্ষের বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘ ঐতিহাসিক বসতি, স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং নিজেদের Indigenous বা আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিবেচনা করা উচিত।
অন্য পক্ষের অবস্থান হলো, বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। বরং ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’ এ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিভাষাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ কোনো জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ‘আদিবাসী নয়’ বলে ঘোষণা করেনি। একইভাবে এটিও সত্য যে সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি।
ফলে সাংবিধানিক পরিভাষা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর পরিভাষাকে এক করে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একটির ভিত্তিতে অন্যটির অস্তিত্ব বা গুরুত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও বিষয়টিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করে।
আত্মপরিচয় কি একমাত্র মানদণ্ড? না। জাতিসংঘের United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) Indigenous Peoples-এর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ঘোষণার Article 3-এ তাদের self-determination বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শুধু নিজেদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে পরিচিত করলেই আন্তর্জাতিক কাঠামোর সব অর্থে সেই পরিচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক নীতিমালায় আত্মপরিচয়ের পাশাপাশি ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনা করা হয়। ILO Convention No. 169-এও Indigenous ও Tribal Peoples শনাক্ত করার ক্ষেত্রে subjective এবং objective—দুই ধরনের মানদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। উপজাতি’ ও ‘আদিবাসী’ কি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়?
আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার দৃষ্টিতে ‘Tribal Peoples’ এবং ‘Indigenous Peoples’ পুরোপুরি সমার্থক নয়।
ILO Convention No. 169-এর Article 1-এ Tribal Peoples বলতে এমন জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে, যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় সমাজের অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক এবং যারা নিজেদের রীতি, প্রথা বা বিশেষ আইন দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে Indigenous Peoples-এর ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠীর বংশধারা, স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে বাস্তবে কোনো জনগোষ্ঠী একই সঙ্গে Indigenous এবং Tribal—উভয় বৈশিষ্ট্য বহন করতে পারে। ILO Convention No. 169-এর মূল উদ্দেশ্য হলো এসব জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা।
বিতর্কের সমাধানের পথ কোথায়? বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে কি না—শুধু এই দ্বিমুখী প্রশ্নে বিতর্ককে সীমাবদ্ধ না রেখে কয়েকটি বিষয় আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বসতির ধারাবাহিকতা কী? দ্বিতীয়ত, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্য কতটা স্বতন্ত্র এবং ধারাবাহিক?
তৃতীয়ত, জনগোষ্ঠীটি নিজেদের পরিচয় কীভাবে নির্ধারণ করে? চতুর্থত, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কী, পঞ্চমত, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামো তাদের কী নামে এবং কী ধরনের অধিকার দিয়ে স্বীকৃতি দেয় এই প্রশ্নগুলো পাশাপাশি রেখে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই বিতর্কটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষভাবে বোঝা সম্ভব।
একটি শব্দের বিতর্ক, নাকি অধিকারের প্রশ্ন, সবশেষে বলা যায়, ‘আদিবাসী’ বনাম ‘উপজাতি’—এটি শুধু একটি শব্দের বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশের সংবিধান বিভিন্ন স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো Indigenous Peoples-এর পরিচয়, অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে।
সুতরাং বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিভাষা এবং আন্তর্জাতিক ‘Indigenous Peoples’ ধারণা একই নথি বা একই সংজ্ঞার বিষয় নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে ‘আদিবাসী’ শব্দকে সরাসরি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন অতিরিক্ত সরলীকরণ, অন্যদিকে সংবিধানে শব্দটি নেই—এটিকে ‘আদিবাসী পরিচয় অস্বীকারের চূড়ান্ত প্রমাণ’ হিসেবে দেখাও একইভাবে বিষয়টিকে সরল করে ফেলে। প্রকৃত অনুসন্ধানের জায়গা তাই শব্দের লড়াইয়ে নয়; বরং ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, আত্মপরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড—এই বিষয়গুলোকে পাশাপাশি রেখে সত্য অনুসন্ধানে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন